Tuesday, July 31, 2018

একটি খোলা চিঠি

প্রিয় পাবলো,
কেমন আছো তুমি  ? জানি তুমি খুব ব্যস্ত। তোমার আঁকা আজ বিশ্ববন্দিত। কত জায়গায় তোমার চিত্র প্রদর্শনী হচ্ছে । তোমার চারপাশে কত মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মাঝে আমাকে কি কোনোদিন খুঁজেছো তুমি? তোমার ম্যাডলিন , তোমার প্রথম মডেল কে , তুমি কি বিস্মৃতির গলিতে ছেড়ে এসেছো, পাবলো? তোমাকে পেয়েও না পাওয়ার কষ্টে পড়ে থেকেছি আমি  মাটি কামড়ে , বাঁচার লড়াইয়ে। নখের আঁচড়ে লিখেছি আমার বিরহ যাতনা-

বেণীমাধব, ও বেণীমাধব
কত'ই না ডেকেছি তোমায়,
এই নামের আড়ালে
লুকিয়ে আছে তোমার পরিচয়।
পারি না তোমায় তোমার নামে ডাকতে,
ভয় হয় যদি লোকে জেনে যায়।
বেণীমাধব, তাই দিলাম তোমার নাম,
হইনি আমি পাড়ার সেলাই দিদিমনি
দিয়েছি আমি পাড়ি সুদূরের পথে
মনের গভীরে তলিয়ে গেছ তুমি
ডুব দিয়ে তুলে আনি কিছু স্মৃতির মণি
নেই তার দাম কারো কাছে,
তবু যদি জানতাম তুমি আছো আমার'ই পাশে।
না তুমি, না তোমার ছায়া
সব'ই রইল অধরা
জীবনের গোধূলি বেলায়
যদি হয় আর একবার দেখা,,,
বেণীমাধব, একটি বার সব কিছু ভুলে
সব বেড়াজাল ভেঙ্গে একবার মিলিয়ে দাও
তোমার আমার জীবন রেখা
বাকী টুকু থাক নাই'বা হলো আঁকা।
জীবনের অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছি। বর্তমান জীবন অনেক দিয়েছে আমায় ,,,টাকা পয়সা, সোনার গয়না , দেশে বিদেশে বেড়াতে যাওয়া ,,,,সামাজিক প্রতিপত্তি - আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যা তোমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল । তুমি পাত্র হিসেবে আমার মায়ের চোখে গ্রহণীয় হয়ে উঠতে পারোনি পাবলো। তোমার স্বপ্ন মেদুর চোখ , গ্রিক দেবতার মতো চেহারা আমাকে পাগল করেছিল , কিন্তু আমার মায়ের চোখে শুধুই ছিল অশনি সঙ্কেত। থাক আজ সেসব কথা। আসলে মনের মধ্যে আজ আমার কথার ফুলকি । তোমায় উজাড় করে না বললে যে আমার ভালোবাসার গল্প অধরাই থেকে যাবে। ইছামতির তীরে বসে তোমার আঁকা সেই ছোট্ট বাচ্চার চারকোল পোট্রেট আজও আছে আমার কাছে । ভেবেছিলাম তোমার সাথে বাঁধবো যখন ঘর , সাজাবো যতনে ,,,,চিকনের পর্দা , পোলকা ডটের চাদর , অগুরুর গন্ধ ,,,একটা ফুলদানি রজনীগন্ধার তোড়ায় সাজানো,,,,,শুধু তোমার আসার অপেক্ষা। তোমার ঘামে ভেজা শরীরের গন্ধ , সিগারেটের গন্ধ - সব কিছুতেই ভালোবাসা ,ভালোবাসা।
উফফ দম টা যেন বন্ধ হয়ে আসছে পাবলো। আমার হাতে সময় বড়ই কম। তোমাকে অনেক কথা বলার ছিল

আজো তোমার অপেক্ষায় গুণে যাই দিন।
জানতে চাও কোথায় আছি...
******
ছেড়ে আমি যায়নি তোমায়
শুধু নদীর স্রোত ছিল প্রতিকূল
সময়ের আলিঙ্গনে জমেছে ধূল।
ভুলে আমি যায়নি তোমায়
রঙিন  করেছি মন তোমার রঙে ,,,,,,।
তোমার নিশ্বাস আজো পাই ঠিক
আমার কানের পাশে
শিহরে ওঠে মন, শরীর-প্রাণ
তোমায় ভুলে যায়নি ,,,,, ।
সব ধূলো মুছে দেব--- যদি তুমি আজো আসো
দু-হাত বাড়িয়ে দেব--- জড়াবো আমার বাহুপাশে।
স ্স্কারের বেড়াজাল করেছে রাস্তা পিচ্ছিল
যত'ই তুমি বাড়াও হাত
পৌঁছাতে দেবেনা আমায় ওরা
রাস্তা বড়'ই  সঙ্কিল।

না না ,,,,ছন্দ মিলছে না । তাল কেটে যাচ্ছে কথার । সময় নেই ,,,আর সময় নেই । আচ্ছা পাবলো , আজো কি তুমি আমায় ভালোবাসো?! নাহ উত্তরের অপেক্ষা করিনা। কারন জানি যখন তুমি এই চিঠি পড়বে ততক্ষনে আমি সমস্ত জাগতিক মায়া কাটিয়ে  পোঁছে যাবো না-মনখারাপ এর দেশে। জানো পাবলো, এই মেশিনগুলো আমায় যে একমুঠো শ্বাস ভিক্ষে দিচ্ছে ওরাও জানে আমার ভিতরটা কত ফাঁকা। তাই সারাদিন পাম্প করেও ফুসফুসে অক্সিজেন পৌঁছায় না । হারিয়ে যায় মাঝ পথে। তোমায় আমার মনের না বলা কথা আজ জানাতে পেরে অনেক হালকা লাগছে । নিজেকে মনে হচ্ছে রাস্তা শেষে আস্তানায় ফেরা কোনো ক্লান্ত পথিক
" 'Tis very sweet to look into the fair
         And open face of heaven,—to breathe a prayer
Full in the smile of the blue firmament.
Who is more happy, when, with heart's content,
         Fatigued he sinks into some pleasant lair
         Of wavy grass, and reads a debonair
And gentle tale of love and languishment?
Returning home at evening, with an ear
         Catching the notes of Philomel,—an eye
Watching the sailing cloudlet's bright career, "
কিটস তোমার বড় প্রিয় ছিল । তাই তাঁকে ই স্মরণ করে বলছি বিদায় বন্ধু, সখা , প্রিয়তম আমার । যদি হয় দেখা অন্য খানে,  অন্য কোনো জগতে ,,সেই আশায় বাঁধে মন।
ভালো থেকো ,
ইতি,
তোমার ,শুধুই তোমার ম্যাডলিন

Monday, July 9, 2018

ক্ষিদে

তিনটে ছোট্ট ঘটনা না উল্লেখ করে পারলাম না বন্ধুরা ,
১) নয়ডার একটি ভিড় ভারাক্কা ওয়ালা মার্কেট ,,,এক বৃদ্ধ শারীরিক ভাবেও খুবই দুর্বল , ,,,প্রচন্ড গরমে রোদে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছিলেন । আমায় দেখেও প্রত্যাশার হাত বাড়িয়ে দিলেন । টাকা আমি দিই না তাই ইতিউতি খুজলাম । আখের রসের দোকান ছিল একটু এগিয়ে, এক গ্লাস রস বরফ ছাড়া বানিয়ে সেই দাদুর হাতে দিলাম , ,,,উনি একচুমুকে শেষ করলেন । জিজ্ঞাসা করলাম আর চাই ,,,তৃপ্তির হাসি দিয়ে মাথা নাড়লেন আর দু হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন । মনে হল সত্যি বোধহয় রামধনু উঠেছে আকাশে।
২)দমদম ক্যান্টনমেন্ট এ 7 তারিখ ছোট্ট বাচ্ছাদের খাওয়ানোর পর ফিরছি, ,, এক বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে যাওয়া দাদু ,,,আমাদের পাস দিয়ে চলে যাছিলেন হঠাৎ মনে হল ,,উনি কিছু বলছেন,,,দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করলাম । উনি বললেন 10 টা টাকা দেবে মা একটু চা বিস্কুট খাবো। বললাম চলুন কি খাবেন আমি খাওয়াছি । বললেন না না আমি নিজেই পারবো , পারলে শুধু ওই 10 টাকা দাও। দিলাম 20 টাকা বললাম আবার সাথে যাবার কথা ,,,কিন্তু উনি চলতে শুরু করলেন । দেখলাম গায়ের ফতুয়াটা শত ছিদ্র 😥
৩) আমার ছোট্ট পুচু সোনার (দেওরের পুচকে) জন্য কেক নিয়ে বেরছি সুগার এন্ড স্পেস থেকে সামনেই একটা রোগ পাতলা ছেলে ছেড়া চটি পরে দাঁড়িয়ে ,,,, আমায় আধো আধো স্বরে বললো "আন্টি আমায় একটা পেস্ট্রি খাওয়াবে" । বললাম আয় ,,,ভেতরে সাজানো পেস্ট্রি দেখিয়ে বললাম কোনটা খাবি । দেখালো চকোলেট পেস্ট্রি । কিনে দিলাম , বললাম বসে খা এক গাল হেসে রাস্তার পাশে পা ছড়িয়ে বসে একটু একটু করে খেতে শুরু করলো।
এমন অনেক ঘটনার আমি সাক্ষী। কিন্তু এই তিনটি ঘটনা সাম্প্রতিক কালেই হয়েছে মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কত জন খাবার নষ্ট করি আর কতজনের কাছে ওই সামান্য টুকুও কত কাঙ্খিত । কবে যে হ্যাভ এন্ড হ্যাভ নটস এর পার্থক্য দূর হবে , সবাই দুবেলা দুমুঠো খেতে পাবে জানি না । ছোট বাচ্চারাও কত বোঝে ,,,একবার একটা বাচ্চাকে খাওয়াবো বলায় সে বলে , দিদি আমার বোনকে ডাকি ও সকাল থেকে কিছু খায়নি। এমন পরিস্থিতিতে ভীষন কষ্ট হয় ।  জানিনা কতজনের মুখে হাসি ফোটাতে পারবো একবেলার জন্য হলেও ,,,,,

Friday, July 6, 2018

প্রথম পদক্ষেপ



একা জানলার ধারে বসে । শিয়ালদহ রাজধানী দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে কলকাতার অভিমুখে। সামনে দিয়ে সবুজ ঘাসের মাঠ, মেঠো পথ , কত নাম না জানা গ্রাম, ছোট শহর মুহূর্তে হারিয়ে যাচ্ছে ফেলে আসা পথের বাঁকে। আমি একা চলেছি আজ । জীবনের এই চল্লিশতম সন্ধ্যায় এসে প্রকৃত পক্ষে একা চলেছি আমি। কোনদিন ভাবিনি আমার ছেলে মেয়েদের ছেড়ে এভাবে চলতে পারবো। কিন্তু কিছু এমন প্রানের টান থাকে যা মাতৃত্বের দায়বদ্ধতা কেও ছাড়িয়ে যায়। মন খুব খারাপ । এই মন কেমনিয়ার কোনো মলম নাই,  নাই কোন পথ্য ।  মনে শুধু একটাই সুর বাজে ,,,, আমি বাড়ি যাবো । আমার অশীতিপর ঠাম্মার কোলে মাথা রেখে সব ভুলে যাবো । ভুলে যাবো আমি কারো মা , কারো স্ত্রী । মনে থাকবে শুধু আমার শৈশব। এমনিভাবেই ধরে রাখতে চাই আমার জীবনদীপ কে , যতই আসুক না কালের হাতছানি,,,, আমি যেতে দেবনা । ভালোবাসা আর আদরে ভরিয়ে রাখবো , মুড়িয়ে রাখবো শ্রদ্ধায় । কেউ যাবে না , কোথাও যাবে না আমায় ছেড়ে । আমি আসছি , আমি আসছি সময়ের গাড়িতে  সওয়ার হয়ে , পড়ন্ত সূর্যের আলোকে সঙ্গী করে ।

ছোটবেলা থেকে রক্ষণশীলতার বেড়াজালে আবদ্ধ জীবন ঠেলে দিয়েছে আমায় এক ভিন্ন দেশে । শিখেছি বাঁচতে, লড়ে আদায় করে নিয়েছি স্থান। সেই অদম্য সাহস কে  কোমরে বেঁধে আমি আসছি , আসছি আমি একা,,,,,। আগত সন্ধ্যার মিষ্টি আওয়াজ আমি শুনতে পাচ্ছি না, কিন্তু অনুভব করতে পারছি প্রতিটি অনু পরমাণু দিয়ে। বাচ্ছাদের খেলা, বড়দের ক্লান্ত পদক্ষেপে বাড়ি ফিরে চলা, রেল লাইন এর ধারে কিছু শ্রমিকদের রান্নার ব্যস্ততা । ওই রান্নার সুবাস কাঁচের জানলা ভেদ করে আমার কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু মনের রসনা তৃপ্তি করে ।

সব কিছুর মধ্যে আমার মন চায় ওই ধোঁয়া ওঠা ইঞ্জিনের চেয়েও আরো জোরে দৌড়ে যেতে। আগল ধরে রাখি মনের , যদি আমায় ফাঁকি দিয়ে যায় । আরে বন্ধু একটু সবুর করো , আমি আসছি , আসছি ওই দিগন্ত্পারের রামধনু সিঁড়ি বেয়ে। আমি আসছি ,,,,

হাতছানি

If you missed the train I'm on
You will know that I am gone
You can hear the whistle blow a hundred miles
A hundred miles, a hundred miles,
A hundred miles, a hundred miles
You can hear the whistle blow a hundred miles"

বাড়ি যেতে মন চায় । কিন্তু মন চাইলেই কি যাওয়া যায় ,,,, একটু আমার ক্লান্ত মন টা ঠাম্মার কোলে মাথা রাখতে চায় ,,, কিন্তু পারছি কই। দায়িত্ব আর মাতৃত্বের দায়বদ্ধতা জড়িয়ে রেখেছে আমার ডানা । যদি দূরত্বটা একটু কম হতো ,,,, সব ওই যদি তে গিয়ে আটকে যায় , কিন্তু জীবন ধারা ঠিকই নিজের গতিপথ পেয়ে যায় শুধু অবুঝ মন একরাশ ক্লান্তি, হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে ঝাঁপ দেয় দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞে । ভুলে যেতে চায় পাওয়া না পাওয়ার হিসেব , দূরে থাকার যন্ত্রনা । হেসে ওঠে ওই বড় মাদারির খেলায় , আবেগের আগুনে উথলে ওঠা অনুভূতি গুলো আবার ছোট ছোট বুদবুদের রূপ নেয় । গড্ডালিকা প্রবাহে এগিয়ে চলে জীবন ।

Friday, May 4, 2018

আমি অমিতা বলছি (২)


 মা চলে গেছেন আজ বেশ কয়েক মাস হল। কোথায় যেন এক অপূরণীয় শূন্যতা,,, দিনের কাজে যেন সেই ভাবে মন লাগে না । দুপুরের ভাত খেতে বসলে পাশের শূন্য আসন টা আরো কষ্ট দেয়। সকাল থেকে উঠে কাজ শুরু হয় । যে হাতে কিছু বছর আগেও খাতা কলম ধরা ছিল , আজ সেই হাত গোবর দিয়ে উঠোন নিকোয়। ঘুঁটে দেয়, গরুর জাবনা দেয় আর অনভ্যস্ত হাতে গরুর দুধ দোয়ায়। যখন বিয়ে হয়ে আসি একটা ট্রাঙ্ক এ আমার যাবতীয় বই খাতা আমার মেজ কাকা দিয়ে দিয়েছিলেন , যদি আমি প্রাইভেটে ম্যাট্রিক দিতে পারি। হয়নি সে সাধ পূরণ। বিশাল সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল । শুনতে হয়েছিল কটূক্তি আত্মীয় দের কাছে পড়াশুনো জানার জন্য। কিন্তু ওই যতদিন মা ছিলেন , উনি যেন সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন ।
ছেলে টা ছোট , আবার সন্তান সম্ভবা। এমন সময় হল জ্বর । উঠতে পারলাম না সারাদিন । দেখলাম আমার ছেলে টাকে ডেকে কেউ খাওয়ালো না। শুনলাম বড় জা শুধু নিজেদের জন্য ও বাবা শ্বশুরের জন্য রান্না করেছেন। ঘরে যা চিড়ে মুড়ি ছিল তাই খেয়ে পেট ভরালো পিতা পুত্র। এই ভাবেই চললো দিন তিনেক । প্রতিবেশী কাকিমার বদান্যতায় ছেলেটা দুমুঠো ভাত খেতে পেল। আমার শ্বশুর মশাই নীরবে পর্যবেক্ষণ করলেন সমস্ত ঘটনা। চার দিনের মাথায় নিজে দোকানে গিয়ে চাল ডাল আলু কিনে আনলেন। আমায় বললেন , "বউমা উঠোনে যে ধান সিদ্ধ করার উনুন আছে সেখানে রান্না করো । আর আজ থেকে আমি তোমাদের কাছেই খাবো "। জ্বরে আক্রান্ত দুর্বল শরীর আর সংসার ভাঙার কষ্ট নিয়ে প্রথম বার আলাদা রান্না করলাম। সেই রান্না ছিল বড়ই বিস্বাদ।  জীবনে ওরম রান্না কোনোদিন খেতে হয়নি আর ।
***************

শুরু হল জীবনের এক নতুন অধ্যায়। বড় ভাসুর রা জমির সবচেয়ে বড় অংশ নিয়ে আলাদা হয়ে গেলেন। আমার স্বামী বললেন সুখের চেয়ে স্বোয়াস্তি ভালো। কোন এক সকালে দেখলাম যে ঘরে তাঁরা থাকতেন সেটা পুরোটাই খুলে নিয়ে চলে গেছেন সাথে নিয়ে গেছেন শাশুড়ি মায়ের সমস্ত বাসন। নিয়তিও বোধহয় অলক্ষ্যে হেসেছিল ভাগ্যের পরিহাস দেখে । আমার উদার মনা স্বামীর মনে এইসব কান্ড কোনো রেখাপাত করেনা । বরঞ্চ নতুন উদ্যোমে কি করে আমাদের জীবন ধারা কে সুষ্ঠভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তাতে মনোযোগ দিলেন। নিজের জমির কিছু অংশ দান করলেন গ্রামে প্রথম লাইব্রেরি তৈরি করতে। মাঠকলের পাঠাগার টা আমার স্বামীর নিজের হাতে গড়ে তোলা। সেখানে অবসর সময়ে বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি ওষুধ ও দেওয়া শুরু করলেন। পাড়ার লোকেরা কেউ বাহবা দিল তো কেউ ,,,,,, থাক না কটু কথা ।

*****************

আগেই বলেছি আমার স্বামী প্রগতিশীল ছিলেন। গ্রামে আমাদের বাড়িতে প্রথম চা খাবার রেওয়াজ চালু হয়। সকাল বেলা এক বড় কটেলি তে চা হতো। গ্রামের অনেক বয়স্ক মানুষ আসতেন চা খেতে। চা এর সাথে দেওয়া হত ছোট ছোট ধামা করে মুড়ি। বাড়ির দাওয়ায় বসে চলতো তাঁদের আলাপ আলোচনা।
এখন কিছুটা সময় বাঁচে আমার।ছেলে আর স্বামী বেরিয়ে গেলে ঘরের কাজের শেষে দুপুরবেলা কিছুটা সময় থাকে  যা একান্তই আমার। আমার হাতের কাজের খুব শখ, তাই বানাই সোয়েটার, কুরুশের কাজের  লেস, বাচ্চাদের টুপি মোজা । আর বানাতাম ঘর সাজানোর জিনিস।
বিকেলে রাখাল গরু নিয়ে ফিরে আসতো। আমি সযত্নে লণ্ঠনগুলো পরিস্কার করে তেল ভরতাম। অন্ধকার হওয়ার আগেই ওগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। দিনের আলো থাকতে থাকতে যতটা সম্ভব কাজ গুছিয়ে নিতে হতো। রাতে লাইব্রেরি থেকে নিয়ে আসা নভেল পড়াটা আমার নেশা ছিল। মনে হতো এক অন্য জগৎ খুলে গেছে আমার সামনে।
*****************
বর্ষায় অনেক সময় ফুটো টালির ফাঁক দিয়ে জল পড়তো। বালতি হাঁড়ি বসিয়ে জল ধরতাম । এইসময় সাপের গর্ত গুলো জলে ডুবে যেত বলে ওদের যত্রতত্র দেখা যেত। সকালে উঠে উনুন ধরাতে গেছি দেখি রাতের পোড়া ছাইয়ের ওপর সাপ কুন্ডলি মেরে আছে , বা ধান সিদ্ধ র হাড়িতে , কিংবা মশারির চালে । পরিবারে এখন বাচ্চার সংখ্যাও বেড়েছে, বেড়েছে তাই আশঙ্কা। এমন ও দেখা গেছে সন্ধ্যায় বাচ্ছারা লন্ঠনের আলোয় দুলে দুলে পড়ছে আর তাদের পিছনে ছোট ছোট গোখরোও ফনা তুলে দুলছে। সে দিন গেছে চলে ,,,,,

**************

বর্ষার প্রকোপ কোমলে বাড়ির ছেলেরা যেত ধান ক্ষেতে , চাঁদনী রাতে । বড় বড় সড়কি, বল্লম আর জাল নিয়ে । সকালে যখন উঠলাম দেখলাম উঠোন ভেসে যাচ্ছে মাছে। যেসব মাছ জিওল তাদের আলাদা করে মেছলায় রেখে দেওয়া হতো জল দিয়ে । বড় মাছের ভাগ যেত আসে পাশের আত্মীয় স্বজনের বাড়ি। আর বেঁচে যাওয়া চিংড়ি ছোট মাছ গুলোকে ধুয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হতো বড় বড় কুলোর উপর । রোজ চলতো রোদ খাওয়ানোর পালা। কিছু তাজা কুচো/মেথি/ধেনো চিংড়ি আর ছোট মাছ পেঁয়াজ রসুন লঙ্কা কুচি  কালো জিরে দিয়ে কড়াই এ অল্প তেলে নেড়ে তারপর নারকেল দিয়ে সিলে বাটা হতো। সেই বাটায় কাঁচা সর্ষের তেল দিয়ে ভাত খাওয়া হতো। সত্যিই কি যে দিন গেছে চলে ফিরে আর আসিবে না ,,,,,,,,,

তখন তো ফ্রিজ ছিল না , তাই কিছু দেশি পদ্ধতিতে সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা হতো। যেমন বেশি মাছ হলে , বিশেষত ইলিশ হলে মাটির হাড়িতে একপ্রস্থ নুন বিছিয়ে মাছ রাখা হতো। আবার তার উপরে নুন দেওয়া হতো। মাটি খুঁড়ে হাড়িটা গলা অব্দি পুঁতে দেওয়া হতো । উপরে যথাযত ঢাকনা দিয়ে রেখে দিন দশেক চলে যেত । যতটা দরকার বের করে নিয়ে হালকা গরম জলে মাছ ধুয়ে রান্না করা হতো।

*************

জীবন সর্বদাই চলনশীল । কারো জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না। মনে পড়ে এক পুজোয় আমার ছেলে তার  বোনের হাত ধরে গ্রামের ঠাকুর দেখতে যাচ্ছে।  মেয়ে আমার একটু সাজুগুজু করতে ভালোবাসে। তা সে নিজের জামা সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু ছলনাময়ী ভাগ্য দেখছিল আর হাসছিল মিটিমিটি। কিছুদিন আগেও বৃষ্টি হয়ে গেছে, মেঠো রাস্তা তাই আরো পিচ্ছিল । জামা সামলাতে গিয়ে দাদার হাত ছেড়ে একাই চলছিল সে,,,,, হঠাৎ পপাত ধরনী তল ।  এক হাঁটু কাঁদায় সে ডুবে গেছে। সবাই ছুটে এসে তাকে টেনে বার করলো। দেখা গেল নতুন জুতো জোড়া ছিঁড়ে কাদাতেই রয়ে গেছে। মেয়ের কান্নায় পুজো দেখা মাথায় উঠলো সবার ।
**********************
আলাদা হবার পর প্রায় এক যুগ কেটে গেছে । ছেলে মেয়েদের কিভাবে ভালো করে পড়ানো যায় সেই চিন্তাই আমার স্বামীকে ভাবিয়ে তুলেছে। শ্বশুর বাবা মারা গেলেন । ভিটের টান এর থেকে ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ এর চিন্তা বড় হয়ে উঠলো। স্টেশনের কাছে একটা ছোট জমি কিনে সেখানে বানানো হল অন্নদা ভবন ,  আমার শ্বশুর বাবা অন্নদা প্রসাদের নামে। সালটা ছিল ১৯৬১ । তিন ছেলে মেয়ে আর স্বামীর হাত ধরে শুরু হল আবার নতুন করে আমার পথ চলা।
**************